গর্ভবতীর খাবার

blog-pic-465

লিখেছেনঃ ডা. কামরুল আহসান, শিশু বিশেষজ্ঞ, সরকারি কর্মচারি হাসপাতাল, ঢাকা। (অনুমতি ব্যাতিত ডক্টরোলার ব্লগের লেখা কোন অনলাইন বা অফলাইন মিডিয়াতে ব্যবহার করা যাবে না)

পরিমিত পুষ্টিকর খাবার সুস্থ জীবনের পূর্বশর্ত। জীবনকে সুস্থ ও সঠিকভাবে চালিয়ে নিতে হলে আমাদের প্রতিদিন পুষ্টিকর খাবার খেতে হয়। আর গর্ভকালীন পুষ্টির বিষয়টি আরও গুরুত্বের সাথে দেখা উচিত। কারণ এর উপরই নির্ভর করে মায়ের সুস্বাস্থ্য, গর্ভস্থ শিশুর সঠিক বেড়ে ওঠা, প্রসবকালীন সময়ের ধকল কাটিয়ে ওঠার শক্তি এবং সফলভাবে স্তন্য পান করানো। মাতৃগর্ভে যে শিশুটি ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে তাঁর পুষ্টির সম্পূর্ণটুকুই মায়ের কাছ থেকে নিতে হয়।

গর্ভবতীর স্বাস্থ্যের সাথেই শিশুর স্বাস্থ্য জড়িত। গর্ভকালীন সময়ে মায়ের সুস্বাস্থ্য বজায় রাখা তাই অত্যন্ত জরুরি। স্বাভাবিকভাবেই পুষ্টির চাহিদা গর্ভকালীন ও স্তন্যদান কালীন সময়ে অন্য সময়ের চেয়ে বেশি। প্রজননক্ষম একজন নারীর স্বাভাবিক অবস্থায় দৈনিক যে পরিমাণ ক্যালরি প্রয়োজন হয়, গর্ভকালীন সময়ে তাঁর চেয়ে দৈনিক ৩০০ ক্যালরি ও স্তন্যদান কালীন সময়ে দৈনিক ৪০০ ক্যালরি বেশি প্রয়োজন হয়। গর্ভধারণের আগে একজন নারীর মোটামুটি ২২০০ ক্যালরি শক্তির প্রয়োজন। সমীক্ষায় দেখা গেছে, আমাদের দেশে গর্ভবতী ও স্তন্যদায়ী মায়েদের মধ্যে শতকরা ৭৪ জন অপর্যাপ্ত খাবার খান। শতকরা ৭০ জন নারী রক্তস্বল্পতায় ভোগেন। খাবারদাবারের ব্যাপারে আমাদের দেশের বাস্তবতা হল এ দেশের নারীরা খায় সবার শেষে, পায় সবচেয়ে কম এবং যা অবশিষ্ট থাকে- Fed last, least and left over। গর্ভবতী নারীর ক্ষেত্রে প্রচলিত এ প্রথা পরিবর্তন করতে হবে। মনে রাখতে হবে সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যৎ ও গোটা পরিবারের ভালো নারীর সুস্বাস্থ্যের উপর নির্ভরশীল। তাই প্রচলিত এই প্রথা ভেঙ্গে গর্ভকালীন সময়ে সঠিক পুষ্টির ব্যবস্থা করতে হবে।

একজন গর্ভবতীর খাবার হওয়া উচিত হালকা, পুষ্টিকর, সহজপাচ্য এবং আমিষ, খনিজ লবণ ও ভিটামিন সমৃদ্ধ। মাছ, মাংস, ডিম থেকে প্রয়োজনীয় আমিষের চাহিদা মেটে, শাক-সবজি, ফলমূলে পাওয়া যাবে খনিজ লবণ আর ভিটামিন। খনিজ লবণ আর ভিটামিন বিশেষ করে আয়রন, আয়োডিন, ক্যালসিয়াম, জিঙ্ক, ফলিক অ্যাসিডের চাহিদার দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। আয়রন রক্তস্বল্পতা থেকে সুরক্ষা দেয়, ক্যালসিয়াম গর্ভস্থ শিশুর হাড়ের গঠনের জন্য প্রয়োজন। দুধ ক্যালসিয়ামের একটি ভালো উৎস। একজন গর্ভবতীর প্রতিদিন ১০০০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম প্রয়োজন। আর স্তন্যদান কালীন সময়ে এ চাহিদা আরও বেড়ে ১৫০০ মিলিগ্রাম হয়ে যায়। প্রতিদিন এক লিটার দুধ পান করলে ক্যালসিয়ামের চাহিদা মেটানো যায়। আর সম্ভব না হলে অন্তত আধা লিটার দুধ পান করা উচিত। দুধ ভিটামিন ডি এর চাহিদাও মেটায়। যারা দুধ পছন্দ করেন না বা দুধ খেলে যাদের সমস্যা হয়, তারা দই খেতে পারেন।

ফোনেই ডাক্তারের সাথে কথা বলতে “e-স্বাস্থ্য” এর সদস্য হন (ক্লিক করুন)

জিঙ্ক আর ফলিক অ্যাসিড শিশুকে বিশেষ কিছু জন্মগত ত্রুটি থেকে রক্ষা করে। ফলিক অ্যাসিডের ঘাটতিতে গর্ভস্থ শিশুর নিউরাল টিউব তৈরিতে বিঘ্ন সৃষ্টি হয় যা Spina Biffda নামের জন্মত্রুটির কারণ। ফলিক অ্যাসিড পাওয়া যাবে গাড় সবুজ পাতাযুক্ত সবজি ও কলিজাতে। জিঙ্কের অভাবে কম ওজনের শিশু জন্ম নিতে পারে। গর্ভস্থ শিশুর থাইরয়েড গ্লান্ডকে সঠিকভাবে কর্মক্ষম রাখতে হলে প্রয়োজন আয়োডিনের। থাইরয়েড হরমোনের অভাব নিয়ে জন্ম নিলে শিশু শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে বড় হবে। আয়োডিন যুক্ত লবণ আর সামুদ্রিক মাছে মিলবে আয়োডিন। খাবারকে স্বাদযুক্ত করতে যে টুকু লবণ প্রয়োজন তাঁর অতিরিক্ত লবণ বর্জন করা উচিত।

ভিটামিন-সি শিশুর হাড় ও দাঁতের গঠনে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। লেবু, কমলা, পেয়ারা, আমলকী, আমড়া, টমেটো, কাঁচামরিচ, তাজা শাক-সবজিতে পাওয়া যাবে ভিটামিন-সি। কোষ্ঠকাঠিন্য গর্ভকালীন সময়ের একটি অবশ্যম্ভাবী অস্বস্তিকর অবস্থা। আঁশযুক্ত খাবার যেমন- শাক-সবজি ও তাজা  ফল খেলে কোষ্ঠকাঠিন্য থেকে থেকে রেহাই মিলে। তাই প্রতিদিনের খাবারে যাতে আঁশযুক্ত খাদ্য থাকে, সেদিকেও নজর দিতে হবে। আর এর সাথে পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করতে হবে। শর্করা ও চর্বি জাতীয় খাবার থেকে প্রয়োজনীয় ক্যালরির বেশিরভাগ জোগান আসে।

পারিবারিক সামর্থ্য, খাদ্যাভ্যাস ও গর্ভবতীর রুচির ব্যাপারটি মাথায় রেখে খাদ্য পরিকল্পনা করা উচিত। সহজলভ্য খাদ্যসামগ্রী দিয়েই গর্ভবতীর দৈনিক পুষ্টি চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। আর এ জন্য যিনি খাদ্য পরিকল্পনা করবেন খাদ্য ও পুষ্টি সম্পর্কে সাধারণ কিছু ধারণা থাকলেই তিনি অতি সহজেই এ কাজটি করতে পারবেন।

ডক্টোরোলা ডট কম (www.doctorola.com) প্রচারিত সকল তথ্য সমসাময়িক বিজ্ঞানসম্মত উৎস থেকে সংগৃহিত এবং এসকল তথ্য কোন অবস্থাতেই সরাসরি রোগ নির্ণয় বা চিকিৎসা দেয়ার উদ্দেশ্যে প্রকাশিত নয়। জনগণের স্বাস্থ্য সচেতনতা সৃষ্টি ডক্টোরোলা ডট কমের (www.doctorola.com) লক্ষ্য। অনুমতি ব্যাতিত ডক্টরোলার ব্লগের লেখা কোন অনলাইন বা অফলাইন মিডিয়াতে ব্যবহার করা যাবে না।

দেশজুড়ে অভিজ্ঞ ডাক্তারদের খোঁজ পেতে ও অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে ভিজিট করুন www.doctorola.com অথবা কল করুন 16484 নম্বরে।

Comments are closed.