সফল অপারেশনে আলাদা হল তোফা আর তহুরা

সফল অপারেশনে আলাদা হল তোফা আর তহুরা

blog-pic-353

বাংলাদেশের চিকিৎসকদের হাতে আজ অবধি যতগুলো জটিল ও আলোচিত অপারেশন হয়েছে তাঁদের মধ্যে যমজ বোন তোফা আর তহুরা কে আলাদা করার ব্যপারটি ছিলো অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশের ইতিহাসে পাইগোপেগাস (মাত্র একটি মলদ্বার থাকা সংযুক্ত শিশু) শিশু আলাদা করার ঘটনা এটিই প্রথম। আসুন জেনে নেই এর বিস্তারিতঃ

তোফা আর তহুরা- যমজ দুই বোন। মাথা-হাত-পা আলাদা হলেও পিঠের নিচ থেকে কোমর পর্যন্ত জোড়া লাগানো। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে সম্প্রতি ৩০ চিকিৎসকের একটি দল প্রায় ৯ ঘণ্টা অস্ত্রোপচার শেষে তাদের দুজনকে পৃথক করেন। সর্বশেষ প্রাপ্ত খবরে জানা যায়, শিশু দুটি সুস্থ ও স্বাভাবিক আছে। তাদের রাতে রাখা হয়েছিল পোস্ট অপারেটিভ কক্ষে। সেখানে তারা স্বাভাবিকভাবে নড়াচড়া করছে বলে জানান হাসপাতালের শিশু সার্জারি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. আশরাফ উল হক কাজল।

উল্লেখ্য, তোফা ও তহুরার সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আলাদা হলেও মলদ্বার ছিল একটি। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এমন ঘটনাকে ‘পাইগোপেগাস’ বলা হয়। গতকালের সফল অস্ত্রোপচারের পর শিশু সার্জারি বিভাগের চিকিৎসকরা জানান, বাংলাদেশের ইতিহাসে পাইগোপেগাস শিশু আলাদা করার ঘটনা এটিই প্রথম। এর আগে অন্যান্য হাসপাতালে তিন জোড়া শিশুকে অস্ত্রোপচার করে আলাদা করা হলেও তাদের ধরন ছিল আলাদা। জন্মের আটদিনের মাথায় শিশু দুটিকে ঢাকা মেডিক্যালে নিয়ে আসা হলে প্রথমে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তাদের মলদ্বার আলাদা করা হয়। দীর্ঘ পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও প্রস্তুতির পর গতকাল মঙ্গলবার সকালে তোফা ও তহুরাকে আলাদা জীবন দেওয়ার অস্ত্রোপচার শুরু করেন দেশের অভিজ্ঞ চিকিৎসকরা।

জানা গেছে, জোড়া লাগানো শিশু তোফা ও তহুরাকে আলাদা করতে গত মঙ্গলবার (১লা অগাস্ট ২০১৭) সকাল ৮ টায় ঢামেক হাসপাতালের তৃতীয় তলার সার্জারি বিভাগে নেওয়া হয়। সেখানকার নিউরোসার্জারি অস্ত্রোপচার কক্ষে সকাল ১০টা থেকে ১৫-১৬ জনের একটি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দল তাদের শরীরে অস্ত্রোপচার শুরু করে। বিভিন্ন বিভাগের প্রায় ৩০ চিকিৎসক দুটি দলে ভাগ হয়ে দীর্ঘ এই অস্ত্রোপচারে অংশ নেন। অস্ত্রোপচার কার্যক্রম চলে বিকাল পাঁচটা পর্যন্ত। অস্ত্রোপচার শেষে বিকাল পাঁচটায় শিশু দুটিকে পোস্ট অপারেটিভ রুমে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে সন্ধ্যায় তাদের জ্ঞান ফিরে আসে।

এ প্রসঙ্গে ঢামেক হাসপাতালের শিশু সার্জারি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. আশরাফ উল হক কাজল বলেন, প্রথমে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তোফা ও তহুরার স্পাইনাল কর্ড ও মেরুদন্ড- আলাদা করা হয়। এ কাজ ভালোভাবে সম্পন্ন হয়। শিশু দুটিকে আলাদা করার পর দুপুরে চিকিৎসকদের অন্য দলটি অস্ত্রোপচারের কাজ শুরু করে। সকাল আট থেকে বিকাল পাঁচটা পর্যন্ত চলে অস্ত্রোপচার কার্যক্রম। অস্ত্রোপচার সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর তাদের পোস্ট অপারেটিভ কক্ষে রাখা হয়। সেখানে সন্ধ্যায় তাদের পা নাড়তে দেখা গেছে। অ্যানেসথেসিয়ার পর তাদের পা নাড়াচাড়া স্বাভাবিক ছিল। শিশু দুইজন এখন ভালো আছে। তবে তারা শঙ্কামুক্ত নয়। তিনি বলেন, জোড়া লাগানো শিশু তোফা-তহুরার জন্মগত সমস্যা ছিল। তাদের মলদ্বার ছিল না। মলতাগের জন্য তাদের অস্থায়ীভাবে পথ তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। ছয় মাস পর ফের অস্ত্রোপচার করে মলত্যাগের স্বাভাবিক পথ তৈরি করে দেওয়া হবে। এরপর আবারও অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে অস্থায়ী মলত্যাগের পথ বন্ধ করে দেওয়া হবে।

এদিকে অস্ত্রোপচার শুরুর পর হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মিজানুর রহমান সাংবাদিকদের বলেছিলেন, দুই সহোদরার মধ্যে তোফা বেশি সক্রিয়। ঝুঁকি থাকলেও আমরা আশাবাদী। আশা করছি অস্ত্রোপচারের পর তারা সুস্থ হয়ে উঠবে। তাদের জন্য আপনারা দোয়া করবেন। আমি তোফা ও তহুরার জন্য সবার কাছে দোয়া চাচ্ছি।

অস্ত্রোপচার চলাকালে বিকাল পৌনে ৩টার দিকে অস্ত্রোপচার কক্ষ থেকে বেরিয়ে অধ্যাপক কানিজ হাসিনা সাংবাদিকদের বলেন, আমরা দীর্ঘ সাড়ে ৬ ঘণ্টা অপারেশন চালিয়ে তোফা ও তহুরাকে আলাদা করেছি। ওরা দুজন এখন আলাদা। দুজনের অবস্থাই স্থিতিশীল। এখনো কিছু রিপেয়ারের কাজ বাকি আছে। আরও দুই-তিন ঘণ্টা সময় আমাদের লাগবে। বর্তমানে তারা সুস্থ ও স্বাভাবিক আছে। প্রতিটি মুহূর্ত তাদের পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। আপাতত আর কিছু বলা যাচ্ছে না।

ঢাকা মেডিক্যালের বার্ন ইউনিটের সমন্বয়ক সামন্ত লাল সেন দুপুরে অপারেশন থিয়েটার থেকে বেরিয়ে এসে সাংবাদিকদের বলেন, কয়েক বছর আগেও বাংলাদেশে এত বড় অপারেশনের কথা ভাবা যেত না। আমাদের চিকিৎসকরা কত বড় অপারেশন করতে পারে; তা আপনারা ভালো করে প্রচার করুন।

এদিকে হাসপাতালের শিশু সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. শাহনুর ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে আলাদা করার পর জ্ঞান ফিরলে তোফা ও তহুরা হাত-পা নাড়া শুরু করে। কান্নাকাটিও করছে তারা। তারা ভালো আছে। তবে আশঙ্কামুক্ত বলার সময় এখনো আসেনি। এত বড় একটা অপারেশন, যতদিন লাগবে, তাদের পোস্ট আপারেটিভ ওয়ার্ডে রাখা হবে। বুধবার তোফা আর তহুরা মায়ের দুধ খেয়েছে। যে ধরনের রেসপন্স দেখলে চিকিৎসকরা ভালো বোধ করেন, তা আমরা পাচ্ছি। আমাদের প্রত্যাশার চেয়েও ভালো আছে তারা। বাকিটা আল্লাহর ইচ্ছা। আপনারা দোয়া করবেন। তিনি বলেন, এত বড় অপারেশনে তারা আলাদা হয়েছে। অনেকেই কৌতূহল নিয়ে দেখতে আসবেন এটিই স্বাভাবিক। তবে দর্শনার্থী যত কম আসবে, তাদের চিকিৎসার জন্য তত ভালো।

সুত্রঃ আমাদের সময়

Doctorola TV (Online Health Channel)

ডক্টোরোলা ডট কম (www.doctorola.com) প্রচারিত সকল তথ্য সমসাময়িক বিজ্ঞানসম্মত উৎস থেকে সংগৃহিত এবং এসকল তথ্য কোন অবস্থাতেই সরাসরি রোগ নির্ণয় বা চিকিৎসা দেয়ার উদ্দেশ্যে প্রকাশিত নয়। জনগণের স্বাস্থ্য সচেতনতা সৃষ্টি ডক্টোরোলা ডট কমের (www.doctorola.com) লক্ষ্য।

 দেশজুড়ে অভিজ্ঞ ডাক্তারদের খোঁজ পেতে ও অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে ভিজিট করুন www.doctorola.com অথবা কল করুন 16484 নম্বরে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *