কিডনীতে পাথর – Kidney stones

blog-pic-300

কিডনির পাথর একটি সর্বজনবিদিত রোগ। আমদের শরীরে বিপাক ক্রিয়ার ফলে যে তরল বর্জ্য পদার্থ তৈরি হয় মুত্রতন্ত্রের মাধ্যমে তা প্রস্রাবরুপে শরীর থেকে বের হয়ে যায়। দেহের সার্বিক সুস্থতার জন্য এসব বিপাকীয় বর্জ্য শরীর থেকে বের করে দেয়া অত্যন্ত জরুরী। এসব বর্জ্য শরীর থাকে বের করতে যে অঙ্গটি সর্বক্ষণ কাজ করে সেটি হচ্ছে মূত্র সংবহনতন্ত্র। এক জোড়া কিডনি, দুটি ইউরেটার, মূত্রথলি ও মুত্রনালি নিয়ে গঠিত মূত্র সংবহনতন্ত্র। নারী-পুরুষ উভয়েরই হতে পারে পাথর। পুরুষদের নারীদের তুলনায় পাথর বেশি হয়। তবে মুত্রেন্ত্রের সংক্রমণজনিত কারণে সৃষ্ট পাথর নারীদের মধ্যে বেশি দেখা দেয়।

পাথরের ধরনঃ রাসায়নিক গঠন অনুসারে বিভিন্ন ধরনের পাথর হতে পারে, যেমন- ক্যালসিয়াম অক্সালেট, ক্যালসিয়াম ফসফেট, ম্যাগনেসিয়াম অ্যাামোনিয়াম ফসফেট, ইউরিক অ্যাাসিড, সিস্টিন পাথর ইত্যাদি। এর মধ্যে ক্যালসিয়াম অক্সালেট পাথরই বেশি হয়। পাথরের অবস্থানের উপর ভিত্তি করে এর নামও বিভিন্ন হয়। যেমন- কিডনিতে পাথর হলে একে বলে রেনাল স্টোন, মূত্রনালিতে হলে বলে ইউরেটেরিক স্টোন আবার মূত্রথলিতে হলে একে বলে ভেসিকল স্টোন, মুত্রনালির স্টোন হলো ইউরেথ্রাল স্টোন।

কারণঃ নানা কারনে হতে পারে এসব পাথর। কারণ গুলোর মধ্যে অন্যতম প্রয়োজনের তুলনায় কম পানি পান করা ও মুত্রতন্ত্রের সংক্রমণ। তাছাড়া কিছু বিপাকজনিত সমস্যাও পাথর হতে পারে। যেমন- হাইপার প্যারাথাইয়েডিজম, গেঁটে বাত বা হাইপার ইউরেসেমিয়া ইত্যাদি। হাইপার প্যারাথাইয়েডিজমে রক্তে ক্যালসিয়ামের পরিমান বেড়ে যায় যা প্রস্রাবের মাধ্যমে বের হয়ে যায়। রক্তের মাত্রাতিরিক্ত ক্যালসিয়াম কিডনি দিয়ে বের হয়ার সময় ক্যালসিয়াম অধঃক্ষেপিত হয়ে পাথরে রুপান্তরিত হয়। ক্যালসিয়াম অক্সালেট ও ক্যালসিয়াম ফসফেট সাধারণত এই পদ্বতিতে তৈরি হয়। মুত্রেন্ত্রের সংক্রমণজনিত কারণে ম্যাগনেসিয়াম অ্যাামোনিয়াম ফসফেট পাথর হয়। যাদের গেঁটে বাত বা রক্তে ইউরিক অ্যাসিডের পরিমাণ বেশি, তাদের ইউরিক অ্যাসিড পাথর হওয়ার আশংকা বেশি। যারা বেশী প্রানিজ প্রোটিন জাতীয় খাবার, বেশি সোডিয়াম আছে এমন খাবার, পরিশোধিত চিনি বেশি খান, তাদের এই পাথর হওয়ার ঝুঁকি বেশি।

চিকিৎসার পরে শতকরা ৫০ ভাগ রোগীর আবার পাথর হওয়ার আশংকা দেখা দেয়, যদি না সতর্কতা অবলম্বন করা হয়। নানা আকারের পাথর হতে পারে। আবার সংখ্যাও হতে পারে এক বা একাধিক। পাথরের অবস্থান, আকার ও সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন রকমের উপসর্গ নিয়ে রোগীরা শরণাপন্ন হতে পারেন চিকিৎসকের। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পাথর ছোট হলে রোগীরা কোনো উপসর্গ ছাড়াই দিব্যি কাটিয়ে দেন সময়। পাথরের অবস্থানের ওপর নির্ভর করে তীব্র ব্যথা, প্রস্রাবের সাথে রক্ত যাওয়া, মূত্র সংক্রমণের উপসর্গ যেমন- প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া, ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া, তলপেটে ব্যথা ইত্যাদি নিয়েও রোগীরা আসতে পারেন। অনেক সময় মুত্রনালিতে পাথর আটকে গিয়ে হঠাৎ প্রস্রাব আটকেও যেতে পারে।

– ইউটিউবে স্বাস্থ্য টিপস পেতে ক্লিক করুন “Doctorola TV” (Online Health Channel) –

যেহেতু মুত্রতন্ত্রের পাথর চিকিৎসার পরও আবার হতে পারেন বা যারা পাথর হওয়ার ঝুঁকিতে আছেন- তাদের ঝুঁকির ধরন অনুযায়ী কিছু খাবারে চলে আসে নিষেধাজ্ঞা। তবে মনে রাখতে হবে, যে কোনো ধরনের পাথরের ক্ষেত্রেই প্রচুর পানি পান করা জ্রুরি। গরমের সময়টাতে যখন তাপমাত্রা ও বাতাসের আদ্রতা বেশি থাকে তখন শরীর থেকে  পেচুর পানি বেরিয়ে যায় ঘাম দিয়ে। এ সময় শরীরে দেখা দিতে পারে পানির ঘাটতি। তখন পানির ব্যাপারে বেশি সতর্ক থাকতে হবে। ক্যালসিয়াম ফসফেট পাথরের ক্ষেত্রে ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস বেশি আছে এমন খাবার পরিত্যাজ্য।

দুধ ও দুধের তৈরি খাবার যেমন- পায়েস, দই, ছানা, পনির ইত্যাদিতে বেশি ক্যালসিয়াম থাকে। ভিটামিন ডি অন্ত্র থেকে ক্যালসিয়াম শোষণ করতে সাহায্য করে। তাই এসব ক্ষেত্রে ভিটামিন ডি-সমৃদ্ধ খাবারও পরিহার করতে হবে। অনেকেই আছেন যারা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিজেরাই ক্যালসিয়াম ট্যাবলেট কনে খান। এটি ঠিক নয়।

ক্যালসিয়াম অক্সালেট পাথরের ক্ষেত্রে অক্সালিট অ্যাসিডসমৃদ্ধ খাবার বর্জন করতে হবে-

উদ্ভিজ্জ উৎসঃ পালংশাক, পুঁইশাক, লালশাক, কচুশাক, খেসারির ডাল, শজনে পাতা, সেলারি পাতা, পার্সলে, পান, কলার মোচা, টমেটো, ওল, কচু, তিল, বাদাম,মটরশুঁটি, বিট, আমলকী, আঙ্গুর, স্ট্রবেরি এডিয়ে চলতে হবে।

অন্যান্যঃ চা, ইন্সট্যান্ট কফি, চকোলেট, কোলা জাতীয় ড্রিংকস, টমেটো সস, ভিটামিন সি যুক্ত ওষুধ।

ইউরিক অ্যাসিড পাথরের ক্ষেত্রে পিউরিনসমৃদ্ধ খাবার বর্জন করতে হবে-

প্রাণিজ উৎসঃ গরু, খাসি, ভেড়ার মাংস, হাসের মাংস, কলিজা, মগজ, চিংড়ি, টুনা মাচগ, মাছের ডিম, প্রাণিজ চর্বি।

উদ্ভিজ্জ উৎসঃ পালংশাক, শিম, শিমের বিচি, মটরশুঁটি, বেগুন, বরবটি, সব ধরনের ডাল, ফুলকপি, মাশরুম, ইস্ট ।

অন্যান্যঃ সস, কৃত্রিম ফলের রস যাতে ফ্রুক্টোজ সিরাপ থাকে।

খাদ্য পরিকল্পনা

কিডনির পাথর যে ধরনেই হোক না কেন, রোগীকে প্রচুর পরিমাণ পানি পান করতে হবে। দৈনিক এমন পরিমাণ পানি পান করতে হবে যাতে ২ লিটার প্রস্রাব তৈরি হয়। প্রস্রাবের রঙ যাতে সব সময় সাদা বা হালকা হলুদ রঙের হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। গরমের সময় যখন তাপমাত্রা ও বাতাসের আর্দ্রতা বেশি থাকে তখন পানি পানের ওপর বেশি নজর রাখতে হবে। সব ধরণের পাথরের ক্ষেত্রে সোডিয়ামসমৃদ্ধ খাবার কম খাওয়া উচিত। কারন প্রস্রাবের সাথে বেশি সোডিয়াম নিঃসৃত হলে তার সাথে ক্যালসিয়াম, ইউরিক অ্যাসিড ও সিস্টিনের নিঃসরণও বেড়ে যায়। প্রস্রাবে সংক্রমণের কোনো লক্ষণ থাকলে তার চিকিৎসাও করতে হবে।

লিখেছেনঃ ডা. কামরুল আহসান, শিশু বিশেষজ্ঞ, সরকারি কর্মচারি হাসপাতাল, ঢাকা।

ডক্টোরোলা ডট কম (www.doctorola.com) প্রচারিত সকল তথ্য সমসাময়িক বিজ্ঞানসম্মত উৎস থেকে সংগৃহিত এবং এসকল তথ্য কোন অবস্থাতেই সরাসরি রোগ নির্ণয় বা চিকিৎসা দেয়ার উদ্দেশ্যে প্রকাশিত নয়। জনগণের স্বাস্থ্য সচেতনতা সৃষ্টি ডক্টোরোলা ডট কমের (www.doctorola.com) লক্ষ্য।

দেশজুড়ে অভিজ্ঞ ডাক্তারদের খোঁজ পেতে ও অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে ভিজিট করুন www.doctorola.com অথবা কল করুন 016484 নম্বরে।

Comments are closed.